akramhossaincf.com

বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ কেন প্রয়োজন এবং এর উপকারিতা কী?

বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। এই খাত কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের দিক থেকেও এটি অত্যন্ত জরুরি। দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, ফলে খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এই চাহিদা মেটাতে হলে কেবল ঐতিহ্যগত কৃষি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আধুনিক কৃষি জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কার্যকর কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা।

কৃষি সম্প্রসারণ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

কৃষি সম্প্রসারণ বলতে বোঝায় এমন একটি কার্যক্রম যার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, উন্নত প্রযুক্তি, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ প্রযুক্তি, রোগ ও পোকা দমন কৌশলসহ কৃষি বিষয়ক নানা তথ্য ও প্রশিক্ষণ পৌঁছে দেওয়া হয়। এই কার্যক্রম কৃষকদের দক্ষ করে তোলে এবং তারা তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়াতে সক্ষম হয়।

কৃষি সম্প্রসারণের মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো:

  • ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধ
  • খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
  • কৃষকের আয় বাড়ানো ও দারিদ্র্য হ্রাস
  • টেকসই কৃষি চর্চা গড়ে তোলা
  • জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো

বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে এবং তাদের একটি বড় অংশ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। দেশের কৃষিভিত্তিক প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, গম, আলু, সবজি, ফল, মাছ এবং প্রাণিসম্পদ।

তবে অধিকাংশ কৃষক এখনো ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে, ফলে তাদের ফলন কম হয় এবং আয়ে তার প্রভাব পড়ে। আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানের অভাবে তারা পিছিয়ে পড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম যদি কৃষকের দরজায় না পৌঁছে, তবে তারা কখনোই নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারবে না। এ কারণেই কৃষি সম্প্রসারণ আজ সবচেয়ে জরুরি।

বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) সরকারিভাবে এই খাতে কাজ করে থাকে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC), কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন এনজিও এবং কিছু বেসরকারি সংস্থাও কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

ইতিবাচক দিক

  • উচ্চ ফলনশীল জাত ও প্রযুক্তি কৃষকদের মাঝে বিতরণ
  • মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং প্রদর্শনী প্লট স্থাপন
  • কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
  • ফসলের বৈচিত্র্য বাড়াতে সম্প্রসারণমূলক প্রকল্প

     

চ্যালেঞ্জ

  • অনেক কৃষক এখনও আধুনিক প্রযুক্তির বাইরে রয়েছে
  • সেচ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও পানি সংকট
  • কৃষকরা অনেক সময় সঠিক তথ্য ও দিকনির্দেশনা পায় না

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই

কেন কৃষি সম্প্রসারণকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন

১. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

বাংলাদেশে জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কিন্তু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। এই সংকট মোকাবেলায় কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বেশি ফলনশীল জাতের ব্যবহার শেখাতে হবে।

২. কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি

কৃষক যদি শুধু ধানের উপর নির্ভর না থেকে বিভিন্ন ফসল, সবজি, মাছ বা প্রাণিসম্পদের উৎপাদন শেখে এবং বাজারে সেগুলো বিক্রি করতে পারে, তাহলে তাদের আয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

৩. টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা

জৈব সার, পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতি এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ কৃষকদের শেখানো গেলে তা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বাড়াবে।

৪. জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো

বর্তমানে খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও লবণাক্ততা বাংলাদেশের কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে খরাপ্রতিরোধী ও সহনশীল জাত, পরিবর্তিত সময় অনুযায়ী চাষাবাদ কৌশল, এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শেখানো কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে সম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়

১. অংশগ্রহণমূলক সম্প্রসারণ মডেল

নীতিনির্ধারণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কৃষকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। তারা যেন নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য পায়, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

২. সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব

সরকার, এনজিও এবং প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয় হলে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে। এতে কৃষকরা সহজেই নতুন প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে।

৩. তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার

মোবাইল ফোন, অ্যাপ্লিকেশন, এসএমএস সেবা, কৃষি হেল্পলাইন, অনলাইন প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি রেডিও ইত্যাদির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে তথ্য পৌঁছানো সহজ ও দ্রুত হয়। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সম্প্রসারণকে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।

৪. নারীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি

নারীরা কৃষির অনেক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তারা পিছিয়ে থাকে প্রশিক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে। তাদের প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও প্রযুক্তি প্রদানে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কৃষির উন্নয়ন। কৃষি খাতকে আধুনিক ও উৎপাদনমুখী করতে হলে কৃষি সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি কেবল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়, বরং কৃষকের উন্নয়নের একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া।

একজন কৃষক যখন আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন হন, তখন তিনি নিজের উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হন। এতে শুধু তার পরিবারের নয়, বরং পুরো জাতির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

তাই এখনই সময়, কৃষি সম্প্রসারণকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও নীতিমালার মাধ্যমে এটিকে আরও শক্তিশালী করা।

কৃষি সম্প্রসারণ হল এমন একটি কার্যক্রম যার মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও চাষাবাদের জ্ঞান দেওয়া হয়।

এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, কৃষকের আয় বাড়ায় এবং টেকসই কৃষি গড়ে তোলে।

তারা উন্নত জাত, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ প্রযুক্তি ও রোগ দমন কৌশল শিখে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারেন।

সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলেই কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সেবা দিচ্ছে, তবে আরও বিস্তারের প্রয়োজন রয়েছে।

Recent Posts

লং টার্মে টিকে থাকতে হলে কৌশলী হতে হবে।
নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ছাড়া আধুনিক নগর নিরাজত্তা অসম্ভব
মেট্রোরেলের বর্তমান রুট সম্প্রসারণ করে ঢাকা-১৩ আসনের এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব!
এমপি প্রার্থী আকরাম হুসাইনের নেতৃত্বে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও শিক্ষার দাবি।
পুরো ঢাকা সিসিটিভি আওতায় আনা জরুরি কেন?
প্রতিবছর দুর্ঘটনা আর প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে, অথচ কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না।
উইকিপিডিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী ‘Grokipedia’ আনছেন ইলন মাস্ক!
পুরো শহরকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা অতীব জরুরি
ট্রাম্প ভিজিটের আগেই যুক্তরাজ্যে গুগলের ৫ বিলিয়ন পাউন্ড এআই বিনিয়োগ
মাস্কের এই সাহসী পদক্ষেপ কি টেসলার ভবিষ্যৎকে নতুন দিকে মোড় দেবে?

ভিডিও বার্তা

আরও পড়ুন
এমপি প্রার্থী আকরাম হুসাইনের নেতৃত্বে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও শিক্ষার দাবি।
এমপি প্রার্থী আকরাম হুসাইনের নেতৃত্বে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও শিক্ষার দাবি।
এমপি প্রার্থী আকরাম হুসাইনের নেতৃত্বে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও শিক্ষার দাবি। Home ঢাকা–১৩...
পুরো ঢাকা সিসিটিভি আওতায় আনা জরুরি কেন?
পুরো ঢাকা সিসিটিভি আওতায় আনা জরুরি কেন? Home ঢাকা, দেশের প্রাণকেন্দ্র...
Scroll to Top